মীর রফিকুল ইসলাম
ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র।
গতকাল শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২টায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানান। এ সময় উপস্থিত সবাই মরহুমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মাত্র ২৪ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। স্বপ্ন ছিল, কঠোর পরিশ্রমে নিজের ভাগ্য বদলাবেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন এবং একদিন গড়ে তুলবেন সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কিন্তু নিউইয়র্কে দীর্ঘ ৩৪ বছর কাটিয়েও পূরণ হয়নি স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সব আশা-আকাঙ্ক্ষা পেছনে ফেলে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন মাগুরা সদর উপজেলার বগিয়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের কাজী আজিজুল হক খোকন। তাঁর এই মর্মান্তিক বিদায় প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা, অপূর্ণ স্বপ্ন ও পরিবারের জন্য আত্মত্যাগের এক বেদনাবিধুর গল্প হয়ে রইল।
নিউইয়র্কে পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকার পর বাংলাদেশি প্রবাসী কাজী আজিজুল হক খোকনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। তাঁর মৃত্যুসংবাদে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘদিনের পরিচিত এই প্রবাসীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। গত ৩ অক্টোবর কুইন্সের কিউ গার্ডেন এলাকার বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন খোকন। পরে এক যাত্রীর সহায়তায় তাঁকে জ্যামাইকা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় মৃত্যুর খবর স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগে। অবশেষে ৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। আকস্মিক এই মৃত্যুতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শোকবার্তায় মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকনের অবদান ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আজ দুপুর ২টায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।তিনি বলেন, জানাজায় উপস্থিত সবাইকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।তিনি আরও জানান, শুক্রবার রাত ১১টায় মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকনের মরদেহ বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হবে।
এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন য যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল, যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সভাপতি সুবল মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
১৯৯২ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে উন্নত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন খোকন। এরপর নিউইয়র্কেই কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৩৪টি বছর। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্নের প্রতীক গ্রিন কার্ড। যে দেশে জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন, সেই দেশেই স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে গেল।
৫৮ বছর বয়সী খোকন নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় বসবাস করতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তিনি জ্যাকসন হাইটসের পরিচিত প্রতিষ্ঠান খামারবাড়ি গ্রোসারি এবং নবান্ন রেস্টুরেন্টের পাশের অবকাশ বুক কর্নারে কাজ করতেন। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন নীরবে। পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালন করাকে জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে রেখেছিলেন তিনি।
খোকনের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি হলো, ৫৮ বছরের জীবনে তিনি নিজের সংসার গড়ে তোলেননি। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থের বড় অংশই পাঠাতেন মাগুরার পুকুরিয়া গ্রামে বসবাসরত মা-বাবা ও ভাইবোনদের কাছে। পরিবারের প্রয়োজন মেটানো এবং স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের জন্য তেমন কোনো সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারেননি তিনি।
যে মানুষটি পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবনের দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়ে দিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ভবিষ্যৎই থেকে গেল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পরিবারের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে করতে নিজের চাওয়া-পাওয়া, ব্যক্তিগত সুখ ও সংসার গড়ার স্বপ্নগুলো যেন আড়ালেই থেকে গিয়েছিল।
আজিজুল হক খোকন ছিলেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ। বিভিন্ন সামাজিক ও কমিউনিটি সমাবেশে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘদিন বিদেশের মাটিতে বসবাস করলেও জন্মভূমি ও পরিবারের প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই তিনি নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে নিয়েছিলেন।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—যে মানুষটি একদিন উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই আজ ফিরতে হচ্ছে কফিনবন্দি হয়ে। যে দেশে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হলো এক বেদনাবিধুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে। বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও নিজের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না তাঁর।
আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই মাগুরায় স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর কথা রয়েছে আজিজুল হক খোকনের মরদেহ। তবে এবার তাঁর ফেরা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায়। থাকবে না নতুন কোনো পরিকল্পনা, থাকবে না ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রত্যাশা। সঙ্গে ফিরবে নিউইয়র্কে কাটানো সাড়ে তিন দশকের স্মৃতি, অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন আর প্রিয়জনদের জন্য রেখে যাওয়া এক গভীর শূন্যতা।
প্রবাসে পাড়ি জমানো অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন প্রায় একই রকম—বিদেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা, স্বজনদের ভালো রাখা এবং একদিন নিজের জন্য একটি সুন্দর জীবন গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন পথ সবার জন্য সমান হয় না। অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা, অনিশ্চয়তা, জীবিকার সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের স্বপ্ন বছরের পর বছর অধরাই থেকে যায়। কেউ কেউ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় থাকেন।
আজিজুল হক খোকনের জীবনও যেন সেই অপূর্ণ প্রত্যাশার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। একবুক স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৩৪ বছর নিউইয়র্কের মাটিতে কাটিয়েছেন, পরিবারের জন্য পরিশ্রম করেছেন, স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অথচ গ্রিন কার্ড পাওয়া হলো না, নিজের সংসারও গড়ে তোলা হলো না। শেষ পর্যন্ত সব স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পেছনে ফেলে তাঁকে চলে যেতে হলো না-ফেরার দেশে।
একজন প্রবাসীর জীবন শুধু উপার্জন, সাফল্য কিংবা বিদেশে বসবাসের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ত্যাগ, অপেক্ষা, নিঃসঙ্গতা এবং পরিবারের জন্য নিজের অনেক কিছু বিসর্জন দেওয়ার ইতিহাস। আজিজুল হক খোকনের বিদায় সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মরহুম কাজী আজিজুল হক খোকনের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি ও ধৈর্য দান করুন। আমিন।
Type your paragraph here
